ছাত্রের ‘ছড়ি’ শিক্ষকের পিঠে: বিশ্ববিদ্যালয় কি তবে ‘ভয়পুরী’?
সপ্তাহজুড়েই দেশে নৈরাজ্য আরও জোরালো হয়েছে। গুলিবিদ্ধ শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যু, দিপু দাসকে হত্যা করে আগুনে পোড়ানো, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচীতে আগুন দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ভয়াবহ তাণ্ডব চলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের হুমকি, মব ও সহিংসতার ঘটনা। এরই মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের একাধিক নেতাকে দেখা গেছে শিক্ষকদের ওপর ‘চড়াও’ হওয়ার মতো মারমুখী আচরণ করতে। তারা শিক্ষকের পিঠে ‘ছড়ি’ চালাবার হুমকি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কার্যত ‘ভয়পুরী’তে পরিণত করেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের একটা বড় অংশ এখন তটস্থ। এর কারণ, গত সপ্তাহে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও রাকসুর বর্তমান জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার হুমকি দিয়ে বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের মদদপুষ্ট কোনো শিক্ষক-কর্মকর্তা চাকরি করলে আগামী রোববার থেকে তাদের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বেঁধে রাখা হবে।’ একই সঙ্গে তিনি ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে আওয়ামীপন্থি ডিনদের পদত্যাগের সময় বেঁধে দেন, ডিনদের চেয়ারে দেখলে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন এবং ‘বাকিটা বুঝিয়ে দেব’ বলে হুঁশিয়ারিও দেন।
এরপরের ঘটনাগুলো আমরা সবাই কমবেশি সংবাদমাধ্যম সূত্রে জেনেছি। আম্মার তার ‘কথা’ রেখেছেন। তিনি গত রোববার নিজেই ছয়জন ডিনের পদত্যাগপত্র লিখে নিয়ে এসে সেই ছয়জন ডিনকে ফোন করেন, তাদের কার্যালয় ও বিভাগে যান। উদ্দেশ্য ছিল জোর করে কিংবা ভয় দেখিয়ে সেই পদত্যাগপত্রে সই করানো। এ ছাড়া তাদের পদত্যাগের দাবিতে সালাহউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে উপাচার্যসহ প্রশাসনের সব কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ ও চাপের হয়ে ওঠে যে উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠকে আওয়ামীপন্থি ছয় ডিন রুটিন দায়িত্ব পালন করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
প্রসঙ্গত বলে রাখা প্রয়োজন, এই ছয়জন ডিনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ১৭ ডিসেম্বর। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ডিন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত পূর্বে নির্বাচিত ডিনরাই রুটিন দায়িত্ব পালন করেন—সেভাবেই উপাচার্য তাদের নির্দেশ দেন।
কিন্তু রাকসুর জিএস আম্মার তার ঘোষণা অনুযায়ী কয়েকজন ডিনের চেম্বারেও যান। তবে এ দিন কোনো ডিন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না। এ সময় আম্মার সাংবাদিকদের বলেন, “জুলাইয়ের সময় শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে দাঁড়ানো শিক্ষকদের তালিকা ডকুমেন্টসসহ আমরা তালিকা করেছি। আওয়ামীপন্থি যে ডিনরা আছেন, সেই ডিনদের পদত্যাগ প্রসঙ্গে তাদের সবাইকে কল দেওয়া হয়। তাদের কেউই ক্যাম্পাসে নাই। আমরা অন্যান্যদের সঙ্গে মিলিয়ে চূড়ান্ত এই তালিকা প্রকাশ করবো এবং সেই অনুযায়ী তাদের পদত্যাগে বাধ্য করাবো।”
এই ডিসেম্বর মাসেই আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও এরকম ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। একবার কবি আল মাহমুদ তার কবিতায় এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘ডাকাতের গ্রাম’ বলে উল্লেখ করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। ‘কদর রাত্রির প্রার্থনা’ নামের বহুল নিন্দিত ও নন্দিত ওই কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘জানতে সাধ জাগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি ডাকাতদের গ্রাম?/ বাল্যে যেমন কোনো গাঁয়ের পাশ দিয়ে নাও বেয়ে ফিরতে গেলে/ মুরুব্বীরা বলতেন ও পথে যেও না অমুকটা হলো ডাকাতদের গ্রাম।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের শিক্ষক লাউঞ্জে গিয়ে পাঁচজন আওয়ামীপন্থি শিক্ষককে হেনস্থা করেছেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, জুবায়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সিঁড়িতে অধ্যাপক জামালউদ্দিনকে হেনস্থা করছেন এবং তাকে ধাক্কা দিচ্ছেন। অনুষদের বাইরে এসে জুবায়ের তার স্যুয়েটার দিয়ে আবারও অধ্যাপক জামালকে এমনভাবে পেঁচিয়ে পাকড়ানার চেষ্টা করেছেন, যে চিত্র দেখলে যে কোনো দর্শকেরই আতঙ্কিত হওয়ার কথা। উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আজমল হোসেন ভূঁইয়াকেও একইদিনে টেনে-হিঁচড়ে হেনস্থা করতে দেখা যায় জুবায়েরকে।
গত বছরের ৫ অগাস্টের পর থেকে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মব তৈরি করে হেনস্থা, জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হাল-আমলের এই ধরনের ঘটনার জমিন তৈরি করেছে, নিঃসন্দেহে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এসব ঘটনা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নতুন দায়িত্ব পাওয়া প্রশাসন এগুলোর ‘চলমান’ থাকার ক্ষেত্রে সরাসরি সহায়তা না করলেও, এর বিপরীতে কার্যকরী ভূমিকা নেননি। সে সময়ও অনেক শিক্ষকের বাড়িতে গিয়েও মব হামলা চালিয়েছিল।
একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, যারা এখন এই ধরনের কর্মকাণ্ড জোরালোভাবে চালাচ্ছে, তারাও আগেও এসবের নেতৃত্ব দিয়েছে এবং প্রতিরোধহীনভাবেই সেই প্রথাকে শাণিত করেছে। এর আগেও রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার পোষ্য কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময় দিনব্যাপী প্রশাসন ভবন তালাবদ্ধ করে রেখেছিলেন। কোটা বহালের সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনসহ একাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তার সঙ্গে তার হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সে সময়ও তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সাদামাটাভাবে বললে একটি বিষয় এখন একেবারেই পরিষ্কার—বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর জ্ঞানচর্চার নিরাপদ পরিসর নয়; সেগুলো পরিণত হয়েছে ‘ওরে খেদাও’, ‘ওরে মারো’, ‘ওরে বেঁধে রাখো’—এই ধরনের হুমকির আখড়ায়। প্রধান উপদেষ্টা, শিক্ষা উপদেষ্টা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য—কেউই শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট করে বলছেন না, ‘তোমরা যা করে চলেছ, এগুলো তোমাদের কাজ নয়। তোমরা পড়াশোনায় ফিরে যাও। তোমরা ছাত্র।’ কেন বলছেন না? কারণ অনেকেই তাদের ব্যবহার করছেন, আগেও করেছেন; এখনও করছেন; তাদের ‘ক্ষমতায়িত’ করার এই তাগাদাই শেষ পর্যন্ত নিজেদের পিঠে ছড়ি পড়ার বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষকদের ‘প্রশাসনিক ভবনের সামনে বেঁধে রাখা হবে’—এই হুমকি দেওয়ার পরও সালাহউদ্দিন আম্মার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বরং রাকসু এই নেতা দিনকে দিন আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেছেন।
এখানে আতঙ্কের পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সুরাহা হওয়া খুবই জরুরি। শিক্ষকসহ অন্যদের ওপর হামলা চালানোর অধিকার ডাকসু বা রাকসু প্রতিনিধিদের কে দিল? ডাকসু, রাকসু, চাকসু, জাকসু কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদের গঠনতন্ত্রে কি এসব করার অনুমতি লেখা আছে? ডিন কে হবেন—সেটি কি শিক্ষার্থীদের এখতিয়ারভুক্ত কোনো বিষয়? একজন শিক্ষার্থী যখন ফেইসবুকে এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে হুমকির পরিবেশ তৈরি করছেন, তখন এর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, বা আদৌ নিচ্ছেন কি?
তাহলে কি আমাদের ধরে নিতেই হবে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আসলে ডাকসু বা রাকসু চালাবে বা চালাচ্ছে? গদি রক্ষার্থে যদি এসব দেখে এগুলোকে ‘শিক্ষার্থীদের দাবি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তবে বাস্তবে এখন যারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বে আছেন, তারা সবাই মিলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শেষ করে দিচ্ছেন। গণঅভ্যুত্থানে কিছুই বদলায়নি। বিগত আমলগুলোতে অনেক শিক্ষক যেমন ক্ষমতার সেবক ছিলেন, এখন আপনারাও ঠিক তাই করছেন—চোখ বন্ধ করে কাদা জামা পরেই।
তবে শিক্ষার্থীরাই আবার এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগসহ আরও অনেক বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেছেন। তারা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, ‘কোনও ব্যক্তি কর্তৃক সম্ভাব্য অন্যায়, অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তা নিষ্পত্তির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সুস্পষ্ট বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। সেই প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে জনসমক্ষে অবমাননাকর ও উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান একজন নির্বাচিত শিক্ষার্থী প্রতিনিধির কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয় এবং এটি দায়িত্বশীল আচরণের চরম ব্যত্যয়।’ এর মানে, অনেকেই এই ধরনের কর্মকাণ্ড পছন্দ করছেন না। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ মেনে নেওয়া হবে না এবং তা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলাপের বিষয় জারি রাখা প্রয়োজন, এবং তা হলো—এই ধরনের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যমের উপস্থাপনের রাজনীতি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে যেমন বলা হয়েছে, আন্দোলনের মুখে ডিনদের পদত্যাগ। তবে কোনটি আন্দোলন, কোনটি চাপ, ভয় বা ভীতি—এগুলো আলাদা করে বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন কাউকে বেঁধে রেখে নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হয়, কার্যালয়ে খোঁজ করা হয় জোর করে সই আদায়ের জন্য, অথবা হেনস্থা করা হয়, তখন কি সেটিকে আমরা সত্যিকারের আন্দোলন হিসেবে ধরতে পারি?
আমরা এতদিন ধরে ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’, ‘জনরোষ’, প্রেশার গ্রুপ, ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’—এই নামগুলো ব্যবহার করে যেসব মব ও সহিংসতাকে প্রশ্রয় দিয়েছি, সমর্থন করেছি, তারই ফলে এই ভয়-ভীতির রাজত্ব সৃষ্টি হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি এবং দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করি যে, বেশিরভাগ শিক্ষার্থী এসবের মধ্যে নেই। কিন্তু এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই বেশিরভাগের শিক্ষাজীবন। একদিকে তাদের পরিচয় ব্যবহার করে এই ধরনের সহিংসতা ও ভয়-ভীতিকে বৈধ করা হচ্ছে, অন্যদিকে তারা ভয়ে এর প্রতিবাদও করতে পারছেন না।
কিন্তু যারা পারতেন, তারা করছেন না। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা উল্টো হুমকি-ধমকিদেনেওয়ালাদেরই সমর্থন উৎপাদনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি, এক ছাত্র নেতা উপাচার্যকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন, ‘আমরা তো আপনাকে উপাচার্য বানিয়েছি, তাই আমাদের কথা শুনতে হবে।’ সব কথা শোনা হচ্ছে, কিন্তু একটিমাত্র বিষয় নেই—আর তা হলো পড়াশোনা।
পড়াশোনা মানেই শুধু ক্লাস এবং পরীক্ষা নয়। অনেকেই হয়তো বলবেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা চলছে। কিন্তু শিক্ষার পরিবেশ যদি বিষাক্ত ও ভীতিকর হয়, শিক্ষার্থী-শিক্ষকের সম্পর্ক ভয়ের ও হেনস্থার, কখনও কখনও প্রাণনাশের হুমকিও থাকে—এমন অবস্থায় কে পড়বে? আর কে কাকে পড়াবে?
